Articles
স্বরাজ ইন্ডিয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সচিব সমীর দাসের প্রতিবেদন: এই রক্তপাত বা তঞ্চকতাই কি আমাদের ভবিতব্য

স্বরাজ ইন্ডিয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সচিব সমীর দাসের প্রতিবেদন: এই রক্তপাত বা তঞ্চকতাই কি আমাদের ভবিতব্য

এই রক্তপাত বা তঞ্চকতাই কি আমাদের ভবিতব্য

পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচন আর কর্নাটকের বিধানসভা নির্বাচন হল প্রায় একই সময়ে। গুরুত্বের বিচারে কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত নির্বাচনের কোনো তুলনা-ই চলেনা। কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় পরাজয় থেকে আগামী লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির জনপ্রিয়তা কতটা অক্ষুণ্ন বা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস আগামী লোকসভায় ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা – তার একটা আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে বলে সকলে অনুমান করেছিলেন। তাই সারা দেশের মানুষের নজর ছিল কর্নাটকের নির্বাচন নিয়ে।

মনোনয়নের পর্ব থেকেই কর্ণাটকে দুই দল সর্ব শক্তি দিয়ে নির্বাচনী প্রচার করেছে। কেউ কাউকে একচুল জায়গাও ছাড়েনি। শাসকের হয়ে যেমন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রচার করেছেন, তেমনি বিরোধীদের হয়ে রাহুল, সোনিয়া সহ তাবড় কংগ্রেস নেতারা প্রচারে পাল্টা লড়াই দিয়েছেন। সেই বাগযুদ্ধ কখনো কখনো শালীনতার সীমা ছাড়িয়েছে। কিন্তু ওই পর্যন্ত্যই, কোথাও রক্তপাত বা প্রাণহানীর কথা শোনা যায়নি। ফল প্রকাশের পর ত্রিশঙ্কু বিধান সভায় ক্ষমতা দখলের কৌশল, পাল্টা কৌশল, দল ভাঙানোর অপকৌশল থেকে মধ্য রাতে সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া, ইয়েদুরাপ্পার তড়িঘড়ি শপথ গ্রহণ করে সরকার গড়ার চেষ্টা, আড়াই দিনের মাথায় সরকারের পতন। সব ধরনের নাটকীয় উপাদান মজুদ থাকলেও, রক্তক্ষয়ী হিংসার কোনো খবর নেই।

অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচন! যেখানে শাসকের বিপুল জয় নিয়ে শাসক – বিরোধী কারো মনেই কোনো সংশয় ছিল না। কারণ পঞ্চায়েতের ভালো কাজের নিদর্শন সাদা চোখেই ধরা পড়ছিল সাধারণ মানুষের কাছে। অতি বড় বিরোধীদের পক্ষেও পঞ্চায়েতে ভালো কাজ হওয়া কে অস্বীকার করা সহজ ছিলনা। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পঞ্চায়েতে বেশ কিছু ভালো কাজের স্বীকৃতি কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে একাধিকবার এসেছিল।

তাই বিরোধীদের পক্ষে পঞ্চায়েতের মত স্থানীয় বিষয় কেন্দ্রিক নির্বাচনে ভালো ফল করা এক কথায় অসম্ভব ছিল। তবুও নির্বাচনের দিন ঘোষণা হতে না হতেই রাজ্য জুড়ে শুরু হয়ে গেল রক্তের হোলি খেলা! শুরু হলো বিরোধীদের মনোনয়ন জমা না করতে দেওয়ার খেলা। রাজ্যের প্রায় ৩৪ % আসনে নির্বাচনই হল না। অতীতের বাম সরকার গায়ের জোরে বিরোধীদের মনোনয়ন জমা না দিতে দেওয়ার খেলা শুরু করেছিল।আজকের তৃণমূল সরকার এই খেলাকে আরো অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করে ফেলেছে আরও নগ্ন ভাবে। ভোট গণনার পরও চলেছে সেই সন্ত্রাস আর নিরবিচ্ছিন্ন খুনের রাজনীতি। আজই সংবাদমাধ্যমে ছবি প্রকাশিত হয়েছে একজন বিদায়ী পঞ্চায়েত সদস্যের স্ত্রী, নির্বাচনে বিক্ষুব্ধ নির্দল প্রার্থীকে সমর্থন করেছিলেন বলে , ওই মহিলাকে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠ বুোস করানো হচ্ছে, গলায় জুতোর মালা পরিয়ে গ্রামে ঘোরানো হচ্ছে ! এতো হিংসা!

পাশাপাশি গতকাল কর্ণাটক বিধানসভায় যুযুধান দুই পক্ষের বিধায়কদের পাশাপাশি বসে ধোসা খাওয়া, গল্প করার দৃশ্যে দেখে সত্তর আশির দশকের কলকাতা ফুটবলের দলবদলের রেষারেষির রোমাঞ্চের কথা মনে পড়ে গেল। টাকার টোপ, গোপন ডেরায় আটকে রাখা, অল্পবিস্তর ভয় দেখানো, স্নায়ু টান রেখে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া – এ সবই দেখা গেল। কিন্তু কোথাও যেন একটা মাত্রা বোধ ছিল, যাতে রক্তপাত এড়ানো যায়। যেটা আমাদের রাজ্যে আশ্চর্যজনক ভাবে অনুপস্থিত।

কেন এইরকম বৈপরীত্য তা সমাজ বিজ্ঞানীদের চর্চার বিষয় হওয়া উচিত। কর্ণাটক নির্বাচনে প্রার্থীরা কেউ সাধু পুরুষ ছিলেন না বরং ওই রাজ্যে নির্বাচনে কালো টাকাও যেমন এই রাজ্যের থেকে অনেক বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে তেমনি দাগী প্রার্থীর সংখ্যাও বেশী। তথাপি নির্বাচন হয় রক্তপাত হীন।

তবে দুই রাজ্যেরই মানুষ যেন বোবা কালা হয়ে গিয়েছে। কোন কিছুতেই তাদের বিকার নেই, ভোটদান ও তার কাছে একটা অভ্যাস মাত্র। যেখানে নৈতিকতা, প্রতিবাদ , আত্মমর্যাদাবোধ ,অপেক্ষা লোভ, ভয় ও উদাসীনতা যেন মানুষ কে গ্রাস করেছে।

তাই এতো অনৈতিক ব্যাপার দেখেও কোথাও মানুষ বলেনি – “এই যে জনপ্রতিনিধি মহাশয় আপনাকে আমি এক দলের হয়ে ভোট দিলাম! আর আমার প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আপনি আমার অপছন্দের দলে যোগ দিচ্ছেন? আমার ভোটটা আমায় ফেরত দিন। আমি তো শুধু আপনাকে ভোট দিইনি আপনার নামের পাশে যে চিন্হটা ছিল সেটাকেও ভোট দিয়েছি।”

এই রাজ্যে উন্নয়ন দেখে রাতারাতি দল বদলু জনপ্রতিনিধিরা বা কর্ণাটকের লুকোচুরি খেলা বিধায়করা সাধারণ মানুষের এতো স্পর্ধার কথা ভাবতেই পারেন না! কিন্তু যারা সংবিধানটা লিখলেন তারাই বা সাধারণ ভোটারের কথা ভাবলেন কই?


লেখক: Samir Das
রাজ্য সচিব, স্বরাজ ইন্ডিয়া পশ্চিমবঙ্গ

mailme.samir.das@gmail.com

The author’s views are personal.