Articles
স্বরাজ ইন্ডিয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য অধ্যক্ষ সঞ্জীব মুখার্জীর প্রতিবেদন: পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর সমস্যাগুলি ও তার মোকাবিলার উপায়

স্বরাজ ইন্ডিয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য অধ্যক্ষ সঞ্জীব মুখার্জীর প্রতিবেদন: পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর সমস্যাগুলি ও তার মোকাবিলার উপায়

পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর সমস্যাগুলি ও তার মোকাবিলার উপায়

আজ পশ্চিমবঙ্গ, অর্থনীতি থেকে শুরু করে সংস্কৃতি, সব ক্ষেত্রেই তার প্রাধান্য হারিয়েছে। আমরা আত্মসমালোচনা করতেও ভুলে গিয়েছি – কেন আমাদের এরকম অবস্থা হল বা কোন উপায়ে আমরা এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। দিনের পর দিন চলে আসা হিংসা এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির দরুন বহু সুযোগ আমরা হারিয়ে বসেছি। “স্বদেশী” ও “স্বরাজ” – এই দুই জাতীয়তাবাদী আদর্শ থেকে উদ্বুদ্ধ জনহিতকর ভাবনায় অভ্যস্ত এক মধ্যবিত্ত শ্রেনীই আমাদের শক্তির মূল উৎস। সময়কালটা ছিল গনপ্রতিষ্ঠানগুলি তৈরী করার এবং যুক্তি-তর্ক ও ভিন্নমত সহনশীল গণতন্ত্রের সংস্কৃতি বিকশিত করার। অবশ্যই এই মধ্যবিত্ত শ্রেনীর সীমাবদ্ধতার কারনে বৃহদাংশের জনগণকে এই উদ্যোগে সামিল করা যায়নি।

সেই ১৯৪০- এর শুরু থেকেই বাংলায় গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর সুত্রপাত। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল ১৯৬০ সাল থেকে শুরু হওয়া আরো কিছু নতুন সমস্যা। এই সমস্যাগুলি আমাদের সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে নিয়েছিল। পরস্পর ঘটে যাওয়া মন্দা, মন্বন্তর, বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ, বিপুল শরণার্থীর আগমন এই রাজ্যের মানুষকে ১৯৪৭ সালে লাভ করা স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করতে দেয় নি। বরঞ্চ ঘটনাগুলি রাজ্যকে একটি দগদগে ঘায়ের মত পরিস্থিতি উপহার দিয়েছিল। তবুও, দুটি পরস্পর বিরোধী শক্তি, মানুষের এই দুঃসহ জীবনের মধ্যেও, নতুন আশার আলো জাগিয়েছিল। একদিকে জহরলাল নেহেরু ও বিধানচন্দ্র রায়ের নতুন ভারত গড়ার বিভিন্ন উদ্যোগ এবং অন্যদিকে বামপন্থীদের নতুন ভাবনা, স্বপ্ন এবং লড়াইয়ের কথা – আমাদের এই সঙ্কট ও দুঃখ দুর্দশার সাথে লড়াই করতে প্রেরনা যুগিয়েছিল।

১৯৬০ –এর মাঝামাঝি সময় থেকে বামপন্থী আন্দোলনগুলি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনে জায়গা করে নেয়। বামদলগুলি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে তারা কংগ্রেস শাসনের একাধিপত্যকে সরিয়ে দেওয়ার জায়গায় চলে আসে। কিন্তু বামপন্থীদের মধ্যে পরপর ঘটে যাওয়া তীব্র আভ্যন্তরীন দ্বন্দ, হিংস্র আচরণ এবং বিভাজন জনগণের আশাগুলিকে বিনষ্ট করে দেয়। ভারতীয় “স্বদেশী” ও “স্বরাজ” ভাবাদর্শের প্রতি আস্থা না দেখিয়ে বামপন্থীরা ভারতীয় আইকন ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে সরাসরি এবং কখনো কখনো শারীরিকভাবে আক্রমণ করে চলে। যা বামপন্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি করে দেয়। বহুমত এবং যুক্তি – তর্কের রাজনীতি দ্রুত বদলে যায় হিংস্রতার রাজনীতিতে এবং তার কফিনে শেষ পেরেকটি পোতা হ্লল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ অবধি শ্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের শাসনকালে। একটি প্রকৃত পরিবর্তনের বদলে, মধ্যবিত্ত শ্রেনী সহ বামপন্থীরা, চূড়ান্ত হিংসার শিকার হয়েছিল – যার থেকে তারা কোনোদিন বেরিয়ে আসতে পারেনি।

যদিও এই পরাজয়ের পর বামপন্থীরা ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল এবং টানা ৩৪ বছর শাসন ক্ষমতায় থেকেছিল। কিন্তু স্বপ্ন দেখা ও লড়াইয়ের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার জন্য এবং অন্ধ বাম আদর্শের প্রতি অনুগত থাকার জন্য বামপন্থীরা নতুন উদ্ভাবনী পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের এই দীর্ঘ শাসনকালের প্রকৃত সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। গোঁড়া বাম মত বলে – সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে, বামপন্থীরা শাসন ক্ষমতায় এলেও – অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যে থাকা জনগণকে শুধুমাত্র কিছুটা অর্থনৈতিক স্বস্তিই দিতে পারা যায় আর জঙ্গী জনআন্দোলনকে সমর্থন করা যায়। এর বেশি কিছু জনগণের জন্য করা যায় না। ১৯৭২ সালে পরাজয়ের পর সংগ্রামের পথ পরিত্যাগ করার ফলে বামেদের কাছে একটাই পথ খোলা ছিল – সেটা হল আর্থিক অভাবের মধ্যে থাকা কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারন মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া। কিন্তু এই সুবিধাদান সাময়িক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার একটা পন্থা মাত্র। এটা কখনো পশ্চিমবঙ্গের গভীর শিকড়যুক্ত সমস্যাগুলি থেকে মুক্তির উপায় হতে পারে না। অবশ্য বামপন্থীদের একটা অজুহাত ছিল – একমাত্র বামপন্থী বিপ্লবই এই সমস্যাগুলি থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। কিন্তু বিপ্লবের কোন সম্ভাবনা ধারে কাছে দেখা যাচ্ছিল না। হঠাৎ তাদের মনে হল মানুষকে আরও কিছুটা স্বস্তি দেওয়া যেতে পারে যদি পুঁজির বিনিয়োগ বাড়ে। এই বোধ তাদের পুঁজিবাদের কাছে শোচনীয় আত্মসমর্পণ করিয়ে সিঙ্গুর – নন্দীগ্রামের মত তাদের শেষ পর্যায়ের পরিস্থিতির মুখোমুখি করিয়ে দিল।১৯৬০ সাল থেকে বামপন্থীদের দ্বারা সৃষ্ট সমস্যাগুলি পশ্চিমবঙ্গের দুঃখ – দুর্দশা আরো বাড়িয়ে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মত গনপ্রতিষ্ঠানগুলি, পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রের সংস্কৃতি এবং এর বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী কে নষ্ট করে দিয়েছে এই বামপন্থী দুরাচার।

বৌদ্ধিক আলোচনা – সমালোচনা, জনপ্রিয় আন্দোলন ইত্যাদি যা ছিল বাংলার রাজনীতির মূল শর্ত তা এখন বদলে গিয়ে হয়েছে একক কত্তত্ববাদী জনপ্রিয়তার অনুসারী – যে ধারার প্রতিনিধিত্ব করছে বর্তমান শাসক। এর থেকেও বেশী বিপদজনক এই শাসকের মুল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে আসছে সাম্প্রদায়িকতায় গভীরভাবে বিশ্বাস করা একটি দল এবং এই রাজ্যকে ক্রমাগত সেই ১৯৪০ সালের সাম্প্রদায়িক বিভাজন, ঘৃণা এবং দাঙ্গার অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এইসব রাজনৈতিক দলগুলির কারোরই এই রাজ্যের প্রকৃত সমস্যাগুলি সম্পর্কে সম্যক ধারনা ছিল না তাই তারা কোন একটা মুক্তির উপায়ও দেখাতে পারেনি। বরঞ্চ, এই রাজনীতি আমাদের আরো একটা গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে দিচ্ছে বলে মনে হয়। এটাই সমসাময়িক কালে আমাদের প্রধান সমস্যা এবং বিপদ।

এই দীর্ঘকাল চলে আসা গভীর সঙ্কট মুক্তির পরিষ্কার রাস্তা আমদের হয়তো জানা নেই, কিন্তু একটা কথা নিশ্চয় করে বলা যায়; কোন আলোচনা – সমালোচনা না করে, দায়িত্বঞ্জানহীন হয়ে চুপচাপ বসে থেকে এই সঙ্কট থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারবো না। আমরা খুবই একটা সহজ পন্থা অবলম্বন করি – আমাদের দুর্দশার জন্য অন্য কোন ব্যক্তি বা শক্তিকে দায়ী করে চুপচাপ বসে থাকি। হয় সেটা সাম্রাজ্যবাদ বা পুঁজিবাদ বা কেন্দ্রীয় সরকার অথবা সাম্প্রতিককালের নতুন এক অভিযোগের ধারা – আমাদের সকল দুর্দশার জন্য দায়ী ঐ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়- যারা নাকি সহিষ্ণু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে এই রাজ্যকে ইসলামীকরনের মাধ্যমে আর একবার দেশভাগের চেষ্টা চালাচ্ছে।

গভীর ভয়, উদ্বেগ ও হতাশা থেকে আমাদের বিশ্বাস তৈরী হয় – যে খারাপ শক্তিগুলির জন্য আমরা এই দুর্দশার শিকার, সেগুলিকে পরাস্ত এবং নির্মূল করে ফেলতে হবে, যাতে এই নারকীয় খাদ থেকে আমরা উঠে দাঁড়াতে পারি। সভ্য, গণতান্ত্রিক ও নৈতিকভাবে এই সমস্যার মোকাবিলা করার একটা রাস্তা বার করে বাঁচার জন্য আমাদের আত্মসমালোচনা, ভাবনা চিন্তা ও তর্ক বিতর্ক শুরু করতে হবে। এটি একটি প্রাথমিক স্তরের বৌদ্ধিক রাজনৈতিক প্রস্তাব। সাধারন মানুষ, বুদ্ধিজীবী শ্রেণী এবং ছাত্রদের একসাথে এগিয়ে এসে তাদের ভাবনা, যুক্তি, বুদ্ধি দিয়ে এই প্রস্তাবকে আরো উন্নত করে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।


লেখক: সঞ্জীব মুখার্জী
রাজ্য অধ্যক্ষ, স্বরাজ ইন্ডিয়া পশ্চিমবঙ্গ

Prof. Sanjeeb Mukherjee taught political science at University of Calcutta. He studied politics in Presidency College and a received a PhD in Philosophy from Jadavpur University.
cusanjeeb@gmail.com

The author’s views are personal.