Articles
স্বরাজ ইন্ডিয়া রাষ্ট্রীয় অধ্যক্ষ যোগেন্দ্র যাদবের প্রতিবেদন: কর্ণাটক দেখে মোদির পতন বা রাহুলের উত্থান ভাবা ভুল

স্বরাজ ইন্ডিয়া রাষ্ট্রীয় অধ্যক্ষ যোগেন্দ্র যাদবের প্রতিবেদন: কর্ণাটক দেখে মোদির পতন বা রাহুলের উত্থান ভাবা ভুল

কর্ণাটক দেখে মোদির পতন বা রাহুলের উত্থান ভাবা ভুল

কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী পদে কুমারাস্বামীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বিভিন্ন অ-বিজেপি দলের নেতা-নেত্রীরা একজোট হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। তবে এই বিরোধী ঐক্য নিয়ে আমি খুব একটা আশাবাদী হতে পারছি না। নরেন্দ্র মোদির চার বছরের শাসনে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধগুলি ভয়ঙ্কর আঘাত পেয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের তরফে জোটবদ্ধ হওযার যেসব চেষ্টা নজরে এসেছে সেগুলি আমাকে হতাশ করেছে। তাই নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিরোধী দলগুলির ঐক্যবদ্ধ হওযার চেষ্টা শেষপর্যন্ত কতটা সফল হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

বস্তুত সদ্য সমাপ্ত কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচন ও তত্পরবর্তী রাজনৈতিক চাপান-উত্থানকে আগামী লোকসভা ভোটের মহড়া বলা যেতে পারে। কর্ণাটকের ভোটযুদ্ধে যুদ্ধলিপ্ত দলগুলি নিজেদের রাজনৈতিক অস্ত্রের কার্যকারিতা পরখ করার সুযোগ পেয়েছে। কর্ণাটকের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে মোদি-শা জুটি নিশ্চিতভাবে ধাক্কা খেয়েছে। তবে এখনই তাঁদের পরাজিতের দলে ফেলাটা ভুল হবে। অনেকে কর্ণাটকে কংগ্রেসের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনকে প্রধান বিরোধী দলের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছেন, যদিও দক্ষিণের রাজ্যের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি দেখে একথা ভাবা বোকামি হবে যে রাহুল গান্ধির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ মসৃণ হযে গিয়েছে। বিধানসভা ভোটের পর পরিস্থিতির প্রয়োজনে কংগ্রেস-জেডিএসকে জোট বাঁধতে হয়েছে। ফল ঘোষণার পর ইয়েদ্দ্যুরাপ্পা শিবির সেখানে যেভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য ঝাঁপিয়েছিল তাতে রাজ্যের দুই অ-বিজেপি দলের সামনে জোট বাঁধা ছাড়া অন্য রাস্তা খোলা ছিল না।

ভারতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি দেখে আমার ১৯৭১, ১৯৭৭ ও ১৯৮৯ সালের লোকসভা ভোটের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ওই নির্বাচনগুলিতেও বিরোধী দলগুলি ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে একমঞ্চে এসেছিল। সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তফাত হল, অতীতে শাসক কংগ্রেসকে রুখতে বিরোধী দলগুলির মধ্যে একজোট হওযার প্রবণতা লক্ষ করা যেত আর এখন বিজেপিকে ঠেকাতে জোট বাঁধার চেষ্টা করছে বিরোধীরা। কেন্দ্র ও রাজ্যগুলিতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেসও সেই জোটে শামিল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত চারবছর ধরে বিজেপি বিরোধী দলগুলি মোদি ঝড় স্তিমিত হওযার অপেক্ষায় ছিল। এই সময়ে তারা নিজেদের মতো করে বিজেপিকে আটকানোর চেষ্টা করেছে। তবে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িযে গেরুয়া শিবিরের বিরুদ্ধে বড়ো কোনো সাফল্য পায়নি বিরোধীরা। তাই নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয়বার কেন্দ্রে ক্ষমতায আসা ঠেকানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা মহাজোট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। কর্ণাটকের ভোট পরবর্তী পরিস্থিতি সেই উদ্যোগকে আরও গতিশীল করেছে। তবে এটাও বোঝা যাচ্ছে, জোট তৈরির শর্তাবলি এখন আর কংগ্রেস ঠিক করবে না, সেই চাবিকাঠি চলে গিয়েছে আঞ্চলিক দলগুলির কাছে।

বিরোধী ঐক্যকে মজবুত করতে হলে সম্ভাব্য শরিক দলগুলিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ভোট-পরবর্তী জোটের চেয়ে প্রাক্-নির্বাচনি সমঝোতা অনেক বেশি কার্যকর হবে বলে মনে হয। সেক্ষেত্রে বিজেপি বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে সমস্যায় পড়বে। উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর ও ফুলপুর লোকসভা আসনে যে উপনির্বাচন হয়েছে তা থেকে বোঝা যাচ্ছে অ-বিজেপি দলগুলির নিজস্ব ভোট ব্যাংক ক্ষেত্র বিশেষে এক বাক্সে আসতে পারে। উত্তরপ্রদেশে যে বিজেপি বিরোধী দলগুলি দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, লোকসভা উপনির্বাচনে তারাই একজোট হয়েছিল। সেই জোটের শরিক দলগুলির ভোটাররা একজোট হয়ে একজন বিরোধী প্রার্থীকেই ভোট দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের উপনির্বাচনে বিরোধী দলগুলির সাফল্য অ-বিজেপি জোটের সম্ভাবনাকে উসকে দিয়েছে। তবে বিরোধীদের সার্বিক ঐক্যের পথে কয়েকটি বাধাও রয়েছে।

প্রথমত, বেশ কিছু রাজ্যে এই জোটের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটে সরাসরি বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে লড়াই হবে। সেখানে অন্য কোনো বিরোধী দলের সঙ্গে কংগ্রেসের আসন সমঝোতার সম্ভাবনা নেই। আবার কেরল, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যগুলিতে বিজেপি ক্ষমতায় আসা দূরে থাক প্রধান বিরোধী দল হিসেবেও জায়গা করে নিতে পারেনি। সেখানেও বিরোধী ঐক্যের ধারণা কার্যকর হবে না। সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে বিজেপি বিরোধী দলগুলির মধ্যেই লড়াই সীমাবদ্ধ থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে একক শক্তিতেই ক্ষমতা ধরে রেখেছে তৃনমূল কংগ্রেস। সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কারো সাহায্য ছাড়াই বিজেপিকে ঠেকাতে পারবেন। এভাবে রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণগুলি ক্ষতিয়ে দেখলে ভারতের অর্ধেক অংশে বিজেপি বিরোধী জোটের অস্তিত্ব কষ্ট-কল্পনা বলেই মনে হয়।

দ্বিতীয়ত, সবক্ষেত্রেই যে বিরোধী দলগুলির নিজস্ব ভোট ব্যাংক এক ছাতার তলায় আসবে তা জোর দিয়ে বলা যায় না। কর্ণাটকের ক্ষেত্রে আসন সমঝোতা না করেও কংগ্রেস ও জেডিএস নিজেদের শক্ত ঘাঁটিগুলি ধরে রাখতে পেরেছে। তেমনই উত্তরপ্রদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে কংগ্রেসের গোটা ভোট ব্যাংকই যে বিজেপি বিরোধী জোটের ঝুলিতে পড়বে তা নিয়ে ভবিষ্যৎবানী করা সম্ভব নয়। তাই কাগজে-কলমে বিরোধী দলগুলি ঐক্যবদ্ধ হলেও বাস্তবে সেই জোট কতটা মসৃণ হবে, তা নিযে প্রশ্ন রয়েছে। লাভ-ক্ষতির নিজস্ব অঙ্কে টিআরএস, টিডিপি, ডিএমকে, জেকেএনসি, বিজেডি, আইএনএলডি ও সর্বোপরি বিএসপির জোটে থাকা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এই দলগুলি অতীতে বিজেপি জোটে যোগ দিয়েছিল। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা বিরোধী শিবিরে শামিল হলেও কতদিন জোটধর্ম পালন করবে, সে বিষয়ে আগে থেকে মন্তব্য করা কঠিন। এইসব প্রশ্ন বাদ দিলেও বিজেপি বিরোধী মহাজোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শরিক দলগুলির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি লাভ-ক্ষতির উপর। সব রাজনৈতিক দলই চাইবে অন্য দলের সমর্থনে নিজেদের জনভিত্তিকে বাড়িয়ে নিতে। উদাহরণ হিসেবে বিহারে আরজেডি-জেডিইউ জোটের কথা বলা যেতে পারে। ওডিশা, তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশেও এই ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ দেখা গিয়েছে। রাজ্যে রাজ্যে অভিন্ন ভোট ব্যাংক নিয়ে বিরোধী দলগুলির মধ্যে টানাপোড়েনও বিরল নয়। তাই সব বাধা কাটিয়ে শেষপর্যন্ত রাহুল গান্ধি যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, লালুপ্রসাদ যাদব, মায়াবতী, অখিলেশ যাদব, শরদ পাওয়ার, চন্দ্রবাবু নাইডু, দেবেগৌড়া, করুণানিধি, চন্দ্রশেখর রাও ও নবীন পট্টনায়কের সঙ্গে জোট করেন, তবে তা ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ করবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায নেতা-নেত্রীদের কর্মসূচি সাধারণ ভোটারদের কাছে গুরুত্ব পায়। পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্য সরকারের কাজ দেখে ভোট দেন। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে সামনে রেখেও সংখ্যালঘু ভোটকে যে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব তা দেখিয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায। তবে নরেন্দ্র মোদির মতো নেতারা যে কোনো পরিস্থিতিকে অনুকূলে আনার ক্ষমতা রাখেন, বিরোধী নেতা-নেত্রীদের সেকথা ভুলে যাওযা উচিত নয়। অতীতেও এই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে। ১৯৭১ সালে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মহাজোট গঠন করেছিল বিরোধীরা। সেবার তাদের প্রধান স্লোগান ছিল, ইন্দিরা হটাও। ইন্দিরা গান্ধি বিরোধীদের প্রচারের উত্তর দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ অন্যভাবে। ইন্দিরার পালটা জবাব ছিল, ইয়ে কেহতে হ্যাঁয় ইন্দিরা হটাও, ম্যায় কেহতি হুঁ গরিবি হটাও (ওরা বলছে ইন্দিরাকে ক্ষমতা থেকে সরাও, আর আমি বলছি দারিদ্র দূর কর।)

বিরোধী জোটের সম্ভাব্য শরিক দলগুলির পারস্পরিক টানাপোড়েন নিয়ে আমি হতাশ নই। আমার অস্বস্তির সবচেয়ে বড়ো কারণ হল, বিরোধী দলগুলির মোদি কেন্দ্রিক একমুখী বিরোধিতা। মোদিকে নিশানা করতে গিয়ে বিরোধীরা বর্তমান সরকারের নেতিবাচক কাজগুলিকে সেভাবে প্রচারের আলোয় আনছে না। অথচ মোদির শাসনে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ভিতগুলি গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমান শাসনের বিকল্প হিসেবে বিরোধীদের উচিত চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওযা। এক, ভারতীয রাষ্ট্র কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল ইতিবাচক জাতীয়তাবাদ, যা বিভিন্ন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মধ্যে সেতুর কাজ করে। এর মাধ্যমেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটাতে হবে। দুই, নির্বাচনে ভালো ফল করতে হলে যে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বুথ স্তরের সংগঠনকে মজবুত করা জরুরি। স্বাধীনতার পর থেকে যে কটি নির্বাচন হয়েছে তার সবগুলিতেই সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী দল ভালো ফল করেছে। তিন, নির্বাচনি রণকৌশলে অভিনবত্ব আনা। চার, এমন এক বা একাধিক মুখকে সামনে নিয়ে আসা যাঁর বা যাঁদের সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বিজেপি বিরোধী জোটের তরফে এই ধরনের কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ছে না। বর্তমান সরকারের আমলে কীভাবে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, সাধারণ মানুষকে তা বোঝানো দূরে থাক, বিরোধী দলগুলি সেদিক থেকে মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

বিরোধীদের একজোট হওযার কৌশল কার্যকর হলে ২০১৯-এ নরেন্দ্র মোদি নিঃসন্দেহে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন। কিন্তু সেই জোট যদি জোড়াতালি দিয়ে তৈরি হয় তবে তা কখনই মোদি শাসনের বিকল্প হতে পারবে না। এরপরেও বিরোধী জোট যদি বিজেপির বিরুদ্ধে সফল হয় তবে সেই সাফল্য ক্ষণস্থাযী হবে। দীর্ঘমেয়াদে যার খেসারত দিতে হবে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রকে।

নিবেদনটি প্রথম প্রকাশ হয়: www.uttarbangasambad.in

Photo credit: PTI


লেখক: যোগেন্দ্র যাদব
স্বরাজ ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রীয় অধ্যক্ষ

yyopinion@gmail.com

লেখকের মতামত বেক্তিগত